কম সিজিপিএ অথবা স্টাডি গ্যাপ নিয়ে মাল্টার ইউনিভার্সিটিতে পড়া যাবে কি?

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় দুটি ভীতি হলো  কম সিজিপিএ (Low CGPA) এবং স্টাডি গ্যাপ (Study Gap)। অনেক সময় পারিবারিক সমস্যা, অসুস্থতা কিংবা কর্মজীবনে প্রবেশের কারণে পড়াশোনায় বিরতি পড়ে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের একাডেমিক রেজাল্ট প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না।

যখনই এই প্রোফাইল নিয়ে কোনো নামী দেশের কথা ভাবা হয়, উত্তর আসে  “তোমার দ্বারা হবে না।” কিন্তু তুমি কি জানো, ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত ইউরোপের সেনজেনভুক্ত দেশ মাল্টা তোমার এই তথাকথিত ‘দুর্বল’ প্রোফাইলকেও সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব কীভাবে তুমি  তোমার খামতিগুলোকে শক্তিতে রূপান্তর করে মাল্টার ভিসা নিশ্চিত করতে পারো।

১. মাল্টা কেন ‘সেকেন্ড চান্স’ এর দেশ?

ইউরোপের অনেক বড় দেশ যেমন জার্মানি বা সুইডেন তাদের একাডেমিক রিকোয়ারমেন্টে কোনো আপস করে না। কিন্তু মাল্টার শিক্ষা ব্যবস্থা কিছুটা নমনীয় এবং ক্যারিয়ারমুখী। মাল্টার প্রাইভেট ইনস্টিটিউটগুলো বিশ্বাস করে, “তোমার অতীত তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।” তারা মূলত দেখে:

  • তুমি বর্তমান সময়ে পড়াশোনার জন্য কতটা আগ্রহী।
  • তোমার পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা আছে কি না।
  • তুমি কেন মাল্টাকে বেছে নিলে (আপনার মোটিভেশন)।

২. কম সিজিপিএ (Low CGPA) কি সত্যিই বাধা?

অনেকেই মনে করে ২.৫০ বা ২.৭৫ সিজিপিএ নিয়ে ইউরোপের স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা। মাল্টার ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

বাস্তব চিত্র:

মাল্টার বেশিরভাগ প্রাইভেট কলেজ (যেমন: LSC, GBSB Global, AUM) ২.২০ থেকে ২.৫০ সিজিপিএ থাকা শিক্ষার্থীদেরও অফার লেটার দিয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে আপনাকে কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে:

  • Relevant Experience: তোমার রেজাল্ট কম থাকলেও যদি সেই বিষয়ে তোমার ২-৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকে, তবে কলেজ তোমার প্রোফাইলকে অগ্রাধিকার দেবে।
  • Strong SOP (Statement of Purpose): তোমার এসওপিতে সততার সাথে ব্যাখ্যা করো কেন তোমার রেজাল্ট আশানুরূপ হয়নি এবং বর্তমানে তুমি কীভাবে তা কাটিয়ে উঠতে চাও।
  • প্রফেশনাল কোর্স: তোমার যদি অতিরিক্ত কোনো ডিপ্লোমা বা শর্ট কোর্স করা থাকে, তবে তা সিজিপিএ-র অভাব পূরণ করতে সাহায্য করতে পারে ।

৩. স্টাডি গ্যাপ: ৫, ৮ নাকি ১০ বছর?

মাল্টায় স্টাডি গ্যাপ নিয়ে যে নমনীয়তা আছে, তা হয়তো ইউরোপের আর কোনো সেনজেন দেশে নেই। এখানে ৫ থেকে ৮ বছরের গ্যাপ খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হয়। এমনকি ১০-১২ বছরের গ্যাপ থাকলেও সঠিক ব্যাখ্যা এবং ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে ভিসা পাওয়া সম্ভব।

কীভাবে গ্যাপ জাস্টিফাই করবে?

তোমার পড়াশোনার বিরতিকে কখনও ‘অলস সময়’ হিসেবে দেখাবে না। এই সময়টাকে ‘এক্সপেরিয়েন্স’ হিসেবে উপস্থাপন করো:

  1. জব সার্টিফিকেট: তুমি যদি কোথাও কাজ করে থাকো , তবে সেই অভিজ্ঞতাকে তোমার প্রোফাইলের অংশ করে দেখতে পারো।
  2. ব্যবসায়িক নথি: যদি নিজের ব্যবসা করে থাকো, তবে ট্রেড লাইসেন্স বা ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে পারো।
  3. স্কিল ডেভেলপমেন্ট: এই সময়ে কোনো বিশেষ দক্ষতা (যেমন: আইটি, গ্রাফিক্স বা ভাষা শিক্ষা) অর্জন করে থাকলে তার সার্টিফিকেট যুক্ত করে দেখতে পারো।

৪. আইইএলটিএস (IELTS) ছাড়া কি সম্ভব?

কম রেজাল্ট বা স্টাডি গ্যাপ থাকলে প্রোফাইল এমনিতেই কিছুটা নাজুক থাকে। এমন অবস্থায় Medium of Instruction (MOI) দিয়ে আবেদন করা সম্ভব হলেও, আমরা সবসময় IELTS (৫.৫ বা ৬.০) দেওয়ার পরামর্শ দিই।

কেন? কারণ একটি আইইএলটিএস স্কোর এম্বাসি অফিসারকে বোঝায় যে, পড়াশোনার বিরতি থাকলেও তুমি  ইংরেজিতে দক্ষ এবং তুমি সত্যিই একজন সিরিয়াস স্টুডেন্ট। এটি তোমার ভিসার সম্ভাবনা ৮০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।

৫. সঠিক কোর্স এবং লেভেল নির্বাচন: একটি ‘প্রো-টিপ’

অনেকেই ভুল করে এখানেই। যাদের অনেক দিনের গ্যাপ বা কম রেজাল্ট, তারা অনেক সময় ভুল লেভেলের কোর্সে আবেদন করে বসে।

  • তোমার যদি বড় গ্যাপ থাকে, তবে মাস্টার্স (Level 7) বা পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্সে আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ।
  • ব্যাচেলর বা ফাউন্ডেশন কোর্সে বড় গ্যাপ সাধারণত ভিসা অফিসাররা ভালো চোখে দেখেন না।

৬. ভিসা ইন্টারভিউ ও ভিএফএস (VFS) প্রস্তুতি

মাল্টার ভিসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ইন্টারভিউ। কম রেজাল্ট বা গ্যাপ নিয়ে যখন তোমাকে প্রশ্ন করা হবে, তখন উত্তর হতে হবে স্মার্ট এবং লজিক্যাল।

ভিসা অফিসার: “তোমার ৫ বছরের গ্যাপ কেন?” তোমার উত্তর: “আমি পড়াশোনার পর অমুক কোম্পানিতে মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছি। সেখানে কাজ করতে গিয়ে আমি বুঝতে পেরেছি যে আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমার একটি গ্লোবাল মাস্টার্স ডিগ্রি প্রয়োজন। তাই আমি মাল্টায় পড়তে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

এই ধরনের আত্মবিশ্বাসী উত্তর তোমার প্রোফাইলের দুর্বলতাকে ঢেকে দিতে পারে ।

৭. খরচ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

মাল্টায় পড়াশোনার খরচ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় বেশ সহনীয়। বছরে ৪০০০ থেকে ৮০০০ ইউরোর(৫,৭২,৯২০.০০-১১,৪৫,৮৪০.০০ টাকা) মধ্যে টিউশন ফি সীমাবদ্ধ থাকে।

  • পার্ট-টাইম কাজ: সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ।
  • পিএসডব্লিউ (PSW): পড়াশোনা শেষ করার পর তুমি সেখানে ৬ মাস থেকে ৯ মাস পর্যন্ত সময় পেতে পারো চাকরি খোঁজার জন্য।
  • ইউরোপীয় নাগরিকত্ব বা পিআর: মাল্টায় দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের মাধ্যমে তুমি ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পেতে পারো।

শেষ কথা: 

কম সিজিপিএ বা স্টাডি গ্যাপ মানেই জীবনের শেষ নয়। এটি কেবল একটি বিরতি। মাল্টা তোমাকে সেই সুযোগটি দিচ্ছে যেখানে তুমি তোমার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারো। সঠিক তথ্য, গোছানো ডকুমেন্টেশন এবং একটু ধৈর্য এই তিনটি জিনিস থাকলে তুমিও খুব শীঘ্রই ভূমধ্যসাগরের পাড়ে বসে কফি খেতে খেতে তোমার ক্লাস উপভোগ করতে পারবে।

তোমার দেশের বাইরে লেখাপড়ার স্বপ্নপূরণে যে কোনো ধরনের সহায়তার জন্য যোগাগাযোগ করুন মাই ড্রিম ক্যাম্পাসে। আমাদের প্রথম ১৫ মিনিটের অনলাইন কনসালটেন্সি সম্পূর্ন ফ্রি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *