মাল্টায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখাটা যতটা রোমাঞ্চকর, সেই স্বপ্ন পূরণের পথে ভিসা প্রসেসিংয়ের দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টা ততটাই ধৈর্য পরীক্ষার। তুমি যদি বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মাল্টায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকো, তবে তোমার মনে সবথেকে বড় যে প্রশ্নটি উঁকি দিচ্ছে তা হলো “সব মিলিয়ে আসলে কতদিন সময় লাগবে?”
অনেকেই মনে করে ৩ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে, আবার কেউ কেউ এক বছর ধরে ঝুলে থাকে। সত্যটা আসলে এর মাঝামাঝি কোথাও। আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমি তোমাকে প্রতিটি ধাপের গাণিতিক হিসাব দেবো এবং জানাবো কীভাবে তুমি মাল্টা MOI Certificate ব্যবহার করে তোমার এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময় কিছুটা কমিয়ে আনতে পারো।
চলো তবে তোমার এই স্বপ্নের যাত্রার সময়রেখা (Timeline) বিশ্লেষণ করি।
১. প্রথম ধাপ: সঠিক কোর্স ও ইউনিভার্সিটি নির্বাচন (সময়: ১৫ – ৩০ দিন)
তোমার মাল্টা যাত্রার ঘড়িটি টিকটিক করে চলা শুরু করবে যখন তুমি প্রথম সিদ্ধান্ত নেবে যে তুমি কোন সাবজেক্টে এবং কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাবে। এই ধাপটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ ভুল ইউনিভার্সিটি বেছে নিলে তোমার পুরো সময়টাই নষ্ট হতে পারে।
- ইউনিভার্সিটি রিসার্চ: মাল্টায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেকগুলো প্রাইভেট কলেজ আছে। তোমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে মিলে এমন একটি কোর্স খুঁজে পেতে অন্তত ১ সপ্তাহ সময় নাও।
- আবেদন ও অফার লেটার: তুমি যখন কাগজপত্র সাবমিট করবে, ইউনিভার্সিটি সেগুলো যাচাই করে তোমাকে একটি ‘কন্ডিশনাল অফার লেটার’ দেবে। এটি পেতে সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহ সময় লাগে।
তোমার সময় বাঁচানোর ট্রিক: মাল্টা MOI Certificate
তুমি যদি আইইএলটিএস (IELTS) পরীক্ষা দেওয়ার কথা ভাবো, তবে মনে রেখো প্রিপারেশন থেকে শুরু করে রেজাল্ট হাতে পাওয়া পর্যন্ত তোমার অন্তত ৩ মাস সময় আলাদা করে রাখতে হবে। কিন্তু তুমি যদি এই ৩ মাস সময় বাঁচাতে চাও, তবে মাল্টা MOI Certificate তোমার জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। যদি তোমার আগের পড়াশোনা ইংরেজি মাধ্যমে হয়ে থাকে, তবে কলেজ থেকে এই সার্টিফিকেটটি দ্রুত সংগ্রহ করে নাও। এতে তুমি সরাসরি মেইন কোর্সে অফার লেটার পাবে এবং আইইএলটিএস-এর দীর্ঘ লাইন তোমাকে এড়াতে সাহায্য করবে।
২. দ্বিতীয় ধাপ: টিউশন ফি ও অ্যাডমিশন কনফার্মেশন (সময়: ১০ – ২০ দিন)
অফার লেটার পাওয়ার পর তোমার প্রথম কাজ হলো ইউনিভার্সিটির প্রথম সেমিস্টার বা এক বছরের টিউশন ফি পাঠিয়ে দেওয়া।
- স্টুডেন্ট ফাইল ওপেনিং: বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে বিদেশে টাকা পাঠাতে তোমাকে একটি ‘স্টুডেন্ট ফাইল’ খুলতে হবে। এতে ব্যাংকিং পেপারস রেডি করতে ৪-৫ দিন সময় লাগে।
- টাকা পৌঁছানো ও কনফার্মেশন লেটার: তোমার পাঠানো টাকা মাল্টায় পৌঁছাতে ৩-৫ দিন সময় লাগে। ইউনিভার্সিটি টাকা বুঝে পাওয়ার পর তোমার নামে ‘ফাইনাল একসেপ্টেন্স লেটার’ বা ‘ভিসা লেটার’ ইস্যু করবে। এটি পেতে আরও এক সপ্তাহ হাতে রাখতে হবে।
৩. তৃতীয় ধাপ: ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন ও অ্যাপোস্টাইল (সময়: ২০ – ৪০ দিন)
ইউরোপের দেশগুলোতে মাল্টা খুব কড়াকড়িভাবে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন করে। তোমার সব একাডেমিক সার্টিফিকেট (এসএসসি, এইচএসসি বা অনার্স) বোর্ড এবং মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত হতে হবে।
- বোর্ড ও মন্ত্রণালয় সত্যায়ন: প্রথমে তোমার শিক্ষা বোর্ড, এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই তিনটি ধাপ পার করতে ১৫-২০ দিন সময় লেগে যায়।
- অ্যাপোস্টাইল (Apostille): বর্তমানে বাংলাদেশেই অ্যাপোস্টাইল সুবিধা চালু হয়েছে। এটি তোমার ফাইলের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দেয়, তবে এর জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে আরও ১-২ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
৪. চতুর্থ ধাপ: ভিএফএস (VFS) গ্লোবাল অ্যাপয়েন্টমেন্টের যুদ্ধ (সময়: ৩০ – ৬০ দিন)
সব কাগজ রেডি থাকার পরও অনেক শিক্ষার্থী এই ধাপে এসে আটকে যায়। মাল্টার সরাসরি এম্বাসি বাংলাদেশে না থাকায় আমাদের ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে দিল্লী এম্বাসিতে ফাইল পাঠাতে হয়।
- স্লট ক্রাইসিস: মাল্টার স্টুডেন্ট ভিসার চাপ এত বেশি যে ভিএফএস এ ফাইল জমা দেওয়ার জন্য স্লট পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। মাঝে মাঝে স্লটের জন্য ১ থেকে ২ মাস অপেক্ষা করতে হয়।
- ফাইল প্রস্তুতি: স্লট পাওয়ার পর তোমার সব কাগজ, ইন্স্যুরেন্স, থাকার বুকিং এবং কভার লেটার গুছিয়ে ভিএফএস-এ সশরীরে জমা দিতে হবে।
৫. পঞ্চম ধাপ: এম্বাসি ও সেন্ট্রাল ভিসা ইউনিট (CVU) প্রসেসিং (সময়: ৩০ – ৯০ দিন)
এটি হলো মাল্টা ভিসা প্রসেসিংয়ের সবথেকে ‘অনিশ্চিত’ সময়। তোমার ফাইল ভিএফএস থেকে দিল্লী যাবে এবং দিল্লী থেকে অনেক সময় ইন্টারনাল ভেরিফিকেশনের জন্য মাল্টার ‘সেন্ট্রাল ভিসা ইউনিট’-এ পাঠানো হয়।
- স্বাভাবিক সময়: এম্বাসি সাধারণত ২১ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে রেজাল্ট দেওয়ার চেষ্টা করে।
- অতিরিক্ত সময়: যদি তোমার ফাইলে কোনো অসঙ্গতি থাকে বা তোমার মাল্টা MOI Certificate ভেরিফাই করার জন্য তোমার কলেজে মেইল পাঠানো হয়, তবে এই সময়টি বেড়ে ৯০ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এই সময়টুকু তোমাকে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পার করতে হতে পারে ।
৬. সামগ্রিক হিসাব: বাংলাদেশ থেকে মাল্টা যেতে মোট কতদিন লাগে?
সবগুলো ধাপ যদি আমরা যোগ করি, তবে তোমার সামনে নিচের চিত্রটি ফুটে উঠবে:
| ধাপের নাম | সম্ভাব্য সময় |
| ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশন ও অফার লেটার | ১ মাস |
| টিউশন ফি পেমেন্ট ও কনফার্মেশন | ২০ দিন |
| ডকুমেন্ট সত্যায়ন ও অ্যাপোস্টাইল | ১ মাস |
| ভিএফএস স্লট ও ফাইল জমা | ১.৫ মাস |
| এম্বাসি ডিসিশন | ১.৫ থেকে ৩ মাস |
| মোট আনুমানিক সময় | ৫ থেকে ৭ মাস |
অর্থাৎ, তুমি যদি সেপ্টেম্বরের সেশনে যেতে চাও, তবে তোমাকে অবশ্যই জানুয়ারী বা ফেব্রুয়ারী থেকে কাজ শুরু করতে হবে।
৭. প্রসেসিং টাইম কমিয়ে আনার কিছু স্মার্ট টিপস
আমি জানি তুমি চাইছো যত দ্রুত সম্ভব ফ্লাই করতে। সময় বাঁচাতে তুমি নিচের কাজগুলো করতে পারো:
- আগেভাগেই MOI রেডি রাখো: অফার লেটারের জন্য আবেদন করার আগে তোমার কলেজ থেকে মাল্টা MOI Certificate টি গুছিয়ে রাখো। এটি তোমার ভর্তির প্রক্রিয়াকে অন্তত ১ মাস ত্বরান্বিত করবে।
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট শুরু করো আজই: ভিসার জন্য ৩-৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট লাগে। তাই তুমি যখন প্রসেসিং শুরু করবে, তার অনেক আগে থেকেই তোমার বা তোমার স্পন্সরের ব্যাংক লেনদেন ঠিক করে ফেলো। শেষের দিকে ব্যাংক নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করলে সময় অনেক নষ্ট হয়।
- ডকুমেন্ট আগে সত্যায়ন করো: অফার লেটার আসার জন্য বসে না থেকে তোমার সব একাডেমিক সার্টিফিকেট বোর্ড ও মন্ত্রণালয় থেকে আগেই সত্যায়িত করে ফেলো। এগুলো সারাজীবন কাজে লাগবে।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আবেদন: ভিএফএস স্লট পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আবেদন করো, কারণ এটি হাতে পেতে ৭-১০ দিন সময় লাগে।
৮. কেন তোমার সময় বেশি লেগে যেতে পারে? (সতর্কবার্তা)
মাঝে মাঝে কিছু ভুল তোমার পুরো ৬ মাসের প্রসেসিংকে ১ বছরে নিয়ে যেতে পারে:
- ভুল ডকুমেন্টস: যদি তোমার পাসপোর্টের সাথে সার্টিফিকেটের নামের মিল না থাকে, তবে এম্বাসি তা সংশোধন করতে বলবে, যা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।
- ইন্টারভিউ কল: দিল্লী এম্বাসি যদি তোমার ইংরেজি দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ করে এবং তোমাকে ভিডিও কল বা ফিজিক্যাল ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকে, তবে প্রসেসিং টাইম আরও বেড়ে যায়।
- ভেরিফিকেশন ডিলে: তোমার কলেজ বা ইউনিভার্সিটি যদি এম্বাসির ভেরিফিকেশন মেইলের উত্তর সময়মতো না দেয়, তবে তোমার ফাইলটি পেন্ডিং লিস্টে পড়ে থাকবে।
৯. শেষ কথা: তোমার প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করছে সব
মাল্টা ভিসা প্রসেসিং সময়সাপেক্ষ হলেও, এটি অসম্ভব কিছু নয়। তোমার যদি সঠিক গাইডলাইন থাকে এবং তুমি যদি প্রতিটি ধাপের জন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকো, তবে তুমি অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়াতে পারবে। বিশেষ করে ল্যাঙ্গুয়েজ প্রুফ হিসেবে মাল্টা MOI Certificate ব্যবহার করলে তুমি যেমন সময় বাঁচাবে, তেমনি আইইএলটিএস-এর দুশ্চিন্তা থেকেও মুক্ত থাকবে।
তোমার দেশের বাইরে লেখাপড়ার স্বপ্নপূরণে যে কোনো ধরনের সহায়তার জন্য যোগাগাযোগ করুন মাই ড্রিম ক্যাম্পাসে। আমাদের প্রথম ১৫ মিনিটের অনলাইন কনসালটেন্সি সম্পূর্ন ফ্রি।



