ভিসা রিজেকশন লেটার যখন হাতে আসে, তখন সেখানে কিছু কোড বা ক্লজ লেখা থাকে। কিন্তু সেই টেকনিক্যাল ভাষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে তোমার ফাইলের কিছু ঘাটতি। চলো সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে আসি।
১. পড়াশোনার উদ্দেশ্যের অভাব (Lack of Intention to Study)
এটি মাল্টা স্টুডেন্ট ভিসা রিজেক্ট হওয়ার এক নম্বর কারণ। ভিসা অফিসার যখন তোমার ফাইল দেখেন, তিনি প্রথমে বোঝার চেষ্টা করেন তুমি কি সত্যিই পড়াশোনা করতে যাচ্ছো নাকি পড়াশোনার নাম করে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছো।
- ভুল সাবজেক্ট চয়েস: তুমি বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছো কমার্সে, কিন্তু মাল্টায় আবেদন করেছো ‘হেলথ কেয়ার’ বা ‘হসপিটালিটি’ নিয়ে যার সাথে তোমার আগের কোনো সম্পর্ক নেই। এই অসামঞ্জস্যতা অফিসারকে সন্দিহান করে তোলে।
- গ্যাপ পিরিয়ড: তোমার যদি পড়াশোনায় ৫-৬ বছরের গ্যাপ থাকে এবং সেই সময়ের কোনো জুতসই কাজের অভিজ্ঞতা বা সার্টিফিকেট না থাকে, তবে তারা মনে করে তুমি আর পড়াশোনার ধারায় নেই।
২. SOP বা মোটিভেশন লেটারের দুর্বলতা
তুমি হয়তো ইন্টারনেটের কোনো একটা সাইট থেকে কপি-পেস্ট করে এসওপি (SOP) লিখেছো। বিশ্বাস করো, একজন ভিসা অফিসার প্রতিদিন শত শত ফাইল দেখেন, তিনি এক নিমেষেই ধরে ফেলেন কোনটি নিজের লেখা আর কোনটি কপি করা।
- সমাধান: তোমার এসওপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে কেন তুমি মাল্টাকে বেছে নিলে (ইউকে বা কানাডা নয় কেন?), কেন ওই নির্দিষ্ট ইউনিভার্সিটি এবং তোমার এই কোর্সটি তোমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে কীভাবে সাহায্য করবে। যদি তোমার কথাগুলোতে আন্তরিকতা না থাকে, তবে ভিসা পাওয়ার আশা খুব কম।
৩. আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব (Financial Stability Issues)
মাল্টা এম্বাসি দেখতে চায় যে তুমি সেখানে গিয়ে কারো ওপর বোঝা হয়ে থাকবে না।
- আকস্মিক বড় লেনদেন: অনেক সময় দেখা যায় আবেদনের ১৫ দিন আগে একাউন্টে ১০-১৫ লাখ টাকা ঢুকানো হয়েছে। এটাকে এম্বাসি ‘Borrowed Money’ বা ধার করা টাকা হিসেবে গণ্য করে থাকে ।
- স্পন্সরের সাথে সম্পর্ক: তোমার স্পন্সর যদি তোমার বাবা-মা বা খুব কাছের কেউ না হয়, তবে অফিসার প্রশ্ন তুলতে পারেন যে ওই ব্যক্তি কেন তোমার পেছনে এত টাকা খরচ করবেন।
৪. ল্যাঙ্গুয়েজ প্রফিসিয়েন্সি ও মাল্টা MOI Certificate এর অপব্যবহার
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী আইইএলটিএস (IELTS) ছাড়াই আবেদন করছে মাল্টা MOI Certificate ব্যবহার করে। এখানে একটা বড় মারপ্যাঁচ আছে।
- MOI মানে হলো ‘Medium of Instruction’। অর্থাৎ তোমার আগের পড়াশোনা ইংরেজিতে ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক কলেজ বা মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এটি শতভাগ প্রযোজ্য হয় না।
- তুমি যখন ভিএফএস (VFS) এ ফাইল জমা দাও বা ইন্টারভিউ ফেস করো, তখন যদি তুমি ইংরেজিতে সাবলীল না হও, তবে তোমার MOI সার্টিফিকেটকে ভুয়া বা দুর্বল মনে করা হয়। এটাই বর্তমানে রিজেকশনের অন্যতম বড় কারণ হয়ে থাকে ।
মাল্টা MOI Certificate: এটি ব্যবহারের সঠিক নিয়ম কী?
তুমি যদি আইইএলটিএস দিতে না চাও, তবে MOI সার্টিফিকেট তোমার জন্য বড় সুযোগ। কিন্তু এটি ব্যবহারের কিছু শর্ত তোমার মেনে চলা উচিত:
- আসল সার্টিফিকেট: এটি অবশ্যই তোমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের প্যাডে এবং সিলমোহরসহ হতে হবে।
- কমিউনিকেশন স্কিল: তোমার কাছে MOI সার্টিফিকেট থাকা মানেই হলো তুমি ইংরেজিতে পারদর্শী। তাই ভিসা অফিসারের সাথে কথা বলার সময় তোমাকে অবশ্যই ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে। তুমি যদি ইংরেজিতে কথা বলতে আটকে যাও, তবে তোমার MOI সার্টিফিকেট কোনো কাজেই আসবে না।
- ব্যাকআপ হিসেবে আইইএলটিএস: আমার পরামর্শ থাকবে, যদি সম্ভব হয় একটি ৫.৫ বা ৬.০ ব্যান্ড স্কোর তুলে রাখো। এতে তোমার ভিসার নিশ্চয়তা প্রায় ৮০% বেড়ে যায়।
রিজেকশন এড়াতে এবং সমাধানে তোমার করণীয়
যদি তোমার ভিসা একবার রিজেক্ট হয়েও থাকে, তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। নিচের সমাধানগুলো ধাপে ধাপে অনুসরণ করো:
১. একটি নিট অ্যান্ড ক্লিন ব্যাংক প্রোফাইল তৈরি করো
ভিসা আবেদনের অন্তত ৪-৬ মাস আগে থেকে তোমার স্পন্সরের অ্যাকাউন্টে নিয়মিত লেনদেন দেখাও। শুধু টাকা থাকলেই হবে না, সেই টাকা কোথা থেকে এলো তার প্রমাণ (যেমন- বেতন, ব্যবসার মুনাফা বা জমি বিক্রির দলিল) সাথে রাখো। মনে রাখবে, এম্বাসি তোমার টাকার পরিমাণের চেয়ে উৎসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
২. নিজের এসওপি নিজে লেখো
কারো সাহায্য নিতে পারো, কিন্তু নিজের অনুভূতি আর পরিকল্পনা সেখানে ঢেলে দাও। তুমি পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে এসে কী করবে, সেটা জোরালোভাবে বলো। বাংলাদেশে তোমার পরিবার, সম্পদ বা চাকুরির অফার আছে এগুলো দেখালে তারা নিশ্চিত হয় যে তুমি অবৈধভাবে সেখানে থেকে যাবে না।
৩. ডকুমেন্ট অ্যাপোস্টাইল (Apostille) করিয়ে নাও
ইউরোপের অনেক দেশ এখন ডকুমেন্টের সত্যতা নিয়ে খুব কড়াকড়ি করে। তোমার সব শিক্ষাগত সার্টিফিকেট শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করার পর সম্ভব হলে বাংলাদেশে মাল্টা কনস্যুলেট বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে অ্যাপোস্টাইল করিয়ে নাও। এটি প্রমাণ করে তোমার সব কাগজ ১০০% আসল।
৪. ইন্টারভিউ প্রিপারেশন
মাল্টা ভিসার জন্য অনেক সময় দিল্লী থেকে ফোন করা হয়। তোমাকে জিজ্ঞেস করতে পারে:
- “What is your course duration?”
- “How many credits are there in your modules?”
- “Where is your university located in Malta?” এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তোমার ঠোঁটের আগায় থাকতে হবে। তুমি যদি নিজের কোর্স সম্পর্কেই না জানো, তবে তারা ধরে নেবে তুমি কেবল বিদেশ যাওয়ার ধান্দায় আছো।
মাল্টা স্টুডেন্ট ভিসার জন্য চেকলিস্ট (নতুন করে সাজাও)
তুমি যখন আবার আবেদন করবে বা প্রথমবারের জন্য ফাইল সাজাবে, এই লিস্টটি মিলিয়ে নিও:
- ভ্যালিড পাসপোর্ট: অন্তত ১৮ মাসের মেয়াদ থাকা ভালো।
- অ্যাডমিশন লেটার: মাল্টা কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (MQF) অনুমোদিত কোনো কলেজ থেকে অফার লেটার।
- পেমেন্ট রিসিপ্ট: অন্তত এক বছরের টিউশন ফি পরিশোধের প্রমাণ।
- থাকার নিশ্চয়তা: অন্তত প্রথম ১৫-২০ দিনের জন্য হোটেল বা কোনো হোস্টেল বুকিং।
- মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স: এটি সেনজেন দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: তোমার নামে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই তার প্রমাণ।
যদি রিজেক্ট হয়েই যায়, তবে ‘আপিল’ করার পদ্ধতি
ভিসা রিজেক্ট হওয়ার পর তুমি দুটি কাজ করতে পারো: ১. নতুন করে আবেদন: যদি রিজেকশন কারণটি খুব সাধারণ হয় (যেমন- ছোটখাটো ডকুমেন্ট মিসিং), তবে নতুন করে আবেদন করা ভালো। ২. আপিল (Appeal): যদি তুমি নিশ্চিত থাকো যে তোমার সব ঠিক ছিল কিন্তু ভুলবশত রিজেক্ট হয়েছে, তবে তুমি আপিল করতে পারো। এর জন্য মাল্টায় একজন রেজিস্টার্ড আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এটি একটু সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল, তবে কার্যকর।
শেষ কথা:
মাল্টা একটি চমৎকার দেশ। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ করার সুযোগ আছে এবং পড়াশোনা শেষে টিআরপি (TRP) পাওয়াও তুলনামূলক সহজ। তবে শর্টকাট রাস্তা খুঁজো না। অনেকে তোমাকে বলবে, “MOI থাকলে আর কিছু লাগে না, ইন্টারভিউ দিতে হবে না” এসব কথায় কান দিও না।
তোমার দেশের বাইরে লেখাপড়ার স্বপ্নপূরণে যে কোনো ধরনের সহায়তার জন্য যোগাগাযোগ করুন মাই ড্রিম ক্যাম্পাসে। আমাদের প্রথম ১৫ মিনিটের অনলাইন কনসালটেন্সি সম্পূর্ন ফ্রি।



