ইউরোপের মানচিত্রে ছোট একটি বিন্দু হলেও, উচ্চশিক্ষা এবং ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে ‘মাল্টা’ এখন এক বিশাল সম্ভাবনার নাম। ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি আর ছবির মতো সুন্দর এই দ্বীপরাষ্ট্রটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু ঝলমলে সমুদ্র সৈকত আর প্রাচীন স্থাপত্যের আড়ালে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, “পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে কি আমি নিজের খরচ চালাতে পারব? মাস শেষে ঠিক কত টাকা পকেটে আসবে?”
আজকের এই ব্লগে আমরা কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বরং মাল্টার শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আয়ের বাস্তবসম্মত হিসাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. স্বপ্ন দেখার আগে নিয়মটা জানুন: কাজের আইনি অধিকার
মাল্টায় পা রাখার সাথে সাথেই তুমি কাজে যোগ দিতে পারবে না এটিই হলো তিক্ত কিন্তু সত্য কথা। মাল্টার নিয়ম অনুযায়ী, তুমি যদি নন-ইইউ (Non-EU) দেশের নাগরিক হয়ে থাকো, তবে তোমাকে কিছু ধাপ পার করতে হবে:
- প্রথম ৯০ দিন বা ‘কুলিং পিরিয়ড’: মাল্টায় প্রবেশের প্রথম তিন মাস আপনি কোনো ধরনের বৈধ কাজ করতে পারবেন না। এই সময়টি আপনার পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার এবং নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য।
- ২০ ঘণ্টার সীমাবদ্ধতা: তিন মাস পর আপনি স্টুডেন্ট ভিসায় সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করার অনুমতি পাবে। এটি একটি আইনি সীমা, যা লঙ্ঘন করলে আপনার ভিসা বাতিলের ঝুঁকি থাকে।
- ওয়ার্ক পারমিট (Jobsplus): কাজ শুরু করার আগে তোমাকে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে ‘Jobsplus’ থেকে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হবে। মনে রাখবেন, মাল্টায় ব্ল্যাকে (অবৈধভাবে) কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
২. আয়ের অংক: প্রতি ঘণ্টায় কত ইউরো?
মাল্টায় একজন স্টুডেন্টের আয় মূলত নির্ভর করে তার কাজের ধরন এবং অভিজ্ঞতার ওপর। ২০২৪-২৫ সালের বাজার বিশ্লেষণ করলে আয়ের চিত্রটি অনেকটা এরকম দাঁড়ায়:
| কাজের ধরন | ঘণ্টা প্রতি আয় (ইউরো) |
| সাধারণ কিচেন হেল্পার / ক্লিনার | €৫.৫০ – €৬.০০ (৭৮৭.৭৭ – ৮৫৯.৩৮ টাকা) |
| ওয়েটার / বার টেন্ডার | €৬.০০ – €৭.৫০ (৮৫৯.৩৮ – ১০৭৪.২৩ টাকা) |
| ডেলিভারি রাইডার (বোল্ট/ওল্ট) | €৭.০০ – €১০.০০ (১০০২.৬১ – ১৪৩২.৩০ টাকা) (কাজের ওপর নির্ভর করে) |
| সুপারশপ সেলস পারসন | €৬.০০ – €৬.৫০ (৮৫৯.৩৮ – ৯৩১.০০ টাকা) |
| হোটেল ফ্রন্ট ডেস্ক / কল সেন্টার | €৭.০০ – €৯.০০ (১০০২.৬১ – ১২৮৯.০৭ টাকা) |
৩. মাসিক আয়ের বাস্তবসম্মত হিসাব (Math That Matters)
চলো, আমরা একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মাসিক আয়ের একটি প্রজেকশন তৈরি করি যে কি না সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করে ।
ক্যালকুলেশন ১ (ন্যূনতম আয়):
যদি আপনার ঘণ্টা প্রতি আয় হয় ৫.৭৫ ইউরো (মিনিমাম ওয়েজ এর কাছাকাছি):
- সাপ্তাহিক আয়: ২০ ঘণ্টা × ৫.৭৫ = ১১৫ ইউরো। (১৪৩.২৩ টাকা)
- মাসিক আয়: ১১৫ × ৪ সপ্তাহ = ৪৬০ ইউরো (৬৫৮৮৫.৮০ টাকা)
ক্যালকুলেশন ২ (গড় আয় + টিপস):
মাল্টায় সার্ভিস সেক্টরে (রেস্টুরেন্ট/বার) কাজ করলে ‘টিপস’ বিশাল একটি সুযোগ। একজন পরিশ্রমী ওয়েটার মাসে ১০০ থেকে ১৫০ ইউরো অনায়াসে আয় করতে পারবেন ।
- বেতন (৬ ইউরো রেট): ৪৮০ ইউরো।
- টিপস: ১২০ ইউরো।
- মোট মাসিক আয়: ৬০০ ইউরো।
বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করলে: বর্তমান রেট (১ ইউরো = ১৩৫ টাকা ধরলে) অনুযায়ী, তোমার মাসিক আয় হবে ৮১,০০০ টাকা!
৪. মাল্টার ‘গোল্ডেন সেক্টর’: যেখানে কাজ পাওয়া সহজ
যদি তুমি দ্রুত কাজ পেতে চাও, তবে নির্দিষ্ট কিছু সেক্টরে ফোকাস করতে পারো। মাল্টা পর্যটন নির্ভর দেশ হওয়ায় নিচের সেক্টরগুলোতে সবসময় লোকবল প্রয়োজন হয়:
ক) হসপিটালিটি সেক্টর (রেস্টুরেন্ট ও হোটেল)
এটি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র। এখানে কেবল বেতন নয়, ফ্রি খাবার এবং ভালো টিপস পাওয়ার সুযোগ থাকে, যা আপনার মাসিক খরচ অনেক কমিয়ে দেয়।
খ) ফুড ডেলিভারি (বোল্ট বা ওল্ট)
তোমার যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে, তবে ডেলিভারি রাইডার হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। তবে এখানে সাইকেল বা স্কুটার চালানোর সক্ষমতা থাকা জরুরি।
গ) রিটেইল বা সুপারশপ
লিডল (Lidl) বা পিএভি (PAVI)-এর মতো বড় সুপারশপগুলোতে সবসময় পার্ট-টাইম সেলস অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রয়োজন হয়। এখানকার কাজের পরিবেশ বেশ গোছানো থাকে।
৫. আয় তো হলো, কিন্তু ব্যয় কত? (The Reality Check)
মাসে ৮০ হাজার টাকা আয় শুনে খুব আকর্ষণীয় মনে হলেও, মনে রাখতে হবে মাল্টায় জীবনযাত্রার একটি ব্যয় আছে।
- বাসা ভাড়া: এটি সবচেয়ে বড় খরচ। একটি শেয়ার্ড রুমে থাকতে আপনার ৩০০ থেকে ৪০০ ইউরো (৪২,৯৬৯ – ৫৭,২৯২টাকা) আনুমানিক খরচ হতে পারে।
- খাবার: নিজে রান্না করে খেলে মাসে আনুমানিক ১৫০ ইউরোতেই (২১৪৮৪.৫০টাকা) সম্ভব। বাইরে খেলে খরচ বেড়ে যাবে।
- ইউটিলিটি ও মোবাইল বিল: আনুমানিক ৫০-৭০ ইউরো (৭১৬১.৫০ – ১০০২৬.১০টাকা) ।
তুমি যদি মাসে ৬০০ ইউরো (৮৫,৯৩৮ টাকা) আয় করতে পারো, তবে ধরে নিতে হবে এর ভেতর অন্তত ৫০০ ইউরো (৭১,৬১৫ টাকা) তোমার খরচ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, পার্ট-টাইম কাজ করে তুমি মাল্টায় থাকা-খাওয়ার খরচ (Living Costs) সম্পূর্ণভাবে মেটাতে পারলে, টিউশন ফি জমানোটা বেশ কঠিন হতে পারে।
৬. কাজ পাওয়ার ৩টি ‘প্রো-টিপস’
মাল্টায় যাওয়ার পর হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কাজ ছিনিয়ে নিতে হবে:
- সিভি (CV) অপ্টিমাইজেশন: ইউরোপিয়ান স্টাইলে (Europass) সিভি তৈরি করতে পারো আগের কোনো কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে তা হাইলাইট করতে পারো ।
- সরাসরি যোগাযোগ: কেবল অনলাইনে আবেদন না করে সিভি হাতে নিয়ে সরাসরি বিভিন্ন ক্যাফে বা দোকানে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে দেখা যেতে পারে। মাল্টিজরা সরাসরি যোগাযোগ পছন্দ করে।
- ফেসবুক গ্রুপ ও নেটওয়ার্কিং: ‘Expats in Malta’ বা ‘Jobs in Malta’ এর মতো গ্রুপগুলোতে যুক্ত হওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশি কমিউনিটির সাথে যোগাযোগ রাখা ভালো।
৭. কিছু সতর্কবার্তা: যা এড়িয়ে চলবে
- ভিসার নিয়ম ভঙ্গ করবেন না: ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়লে সারাজীবনের ইউরোপের স্বপ্ন শেষ হয়ে যেতে পারে।
- পড়াশোনায় অবহেলা: মাল্টায় ভিসা রিনিউ করতে হলে তোমার উপস্থিতির হার (Attendance) এবং রেজাল্ট ভালো থাকতে হয়। কাজ করতে গিয়ে ক্লাসে না গেলে সমস্যা হতে পারে।
শেষকথা
মাল্টায় স্টুডেন্ট হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ করা কেবল টাকার জন্যই নয়, এটি তোমাকে একটি আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। মাস শেষে ৭০-৮০ হাজার টাকা আয়ের সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি জীবন গড়ার জন্য কঠোর সংগ্রামের প্রয়োজনও আছে। তুমি যদি পরিশ্রমী হও এবং সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারো, তবে মাল্টা তোমার জন্য সফলতার দুয়ার খুলে দিতে প্রস্তুত।
তোমার দেশের বাইরে লেখাপড়ার স্বপ্নপূরণে যে কোনো ধরনের সহায়তার জন্য যোগাগাযোগ করুন মাই ড্রিম ক্যাম্পাসে। আমাদের প্রথম ১৫ মিনিটের অনলাইন কনসালটেন্সি সম্পূর্ন ফ্রি।



